শম্বুকগতি - অরিন্দম নাথ













এই লেখাটি ঠিক গল্প নয় ৷ মেঘনাদবাবুর মনের ভাবনা ৷ গতকাল ছিল বিজয়া দশমী ৷ সকালে তিনি একবার বেরিয়েছিলেন ৷ বিশালগড়-বিশ্রামগঞ্জ হয়ে আগরতলা থেকে উদয়পুর ৷ বিকেলে ফিরে আসেন ৷ জম্পুইজলা-গাবর্দি সড়ক ধরে ৷ মধ্যে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল ৷ বিকেলের দিকে আকাশ অনেকটা পরিষ্কার ৷ মাঝে-মধ্যে কালো মেঘের আনাগোনা ৷ তথাপি দিনটি আগের দু`দিনের তুলনায় অপেক্ষাকৃত শুষ্কই ছিল ৷ মেঘনাদবাবুর আঙ্গিনায় একটি শিউলি গাছ আছে ৷ গোধূলির আলোতে আনমনে তাকিয়েছিলেন গাছটির দিকে ৷ এ`বার গাছটিতে ফুল বলতে গেলে আসেই নি ৷ শুধু শরতের প্রতীক হিসাবে একটি দু`টি ফুল নজরে আসছিল ৷ গাছটিতে একটি আঙ্গুর-থোকার গাছের লতাও গজিয়েছে ৷ অনেকগুলি গোলাপি আঙ্গুর-থোকা ফুল, বেশ দৃপ্ত ভঙ্গিতে উঁকি দিচ্ছিল ৷ যেন কৃত্রিম আলোর রোশনাই ৷ অথচ, শরতের আগ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন ছিল না ৷ গত বছর মহালয়ার পর থেকে, এই কয়েকমাস আগ-পর্যন্ত শিউলি গাছটিতে প্রচুর ফুল এসেছিল ৷ পত্রিকায় পড়েছেন অর্থনৈতিক মন্দা চলছে ৷ ‘শীতের বনে কোন্ সে কঠিন আসবে ব'লে, শিউলিগুলি ভয়ে মলিন...’৷

 শীত কি এ`বার আগেই চলে আসবে?

এই বছর দুর্গাপূজা সহজ হিসাবে এসেছিল ৷ সাতাশে সেপ্টেম্বর সপ্তমী ৷ আটাশে অষ্টমী ৷ উনত্রিশে নবমী ৷ ত্রিশে দশমী ৷ ডেসিম্যাল সিস্টেমের সাথে মিল রেখে ৷ পূজার তিথি নির্ণয় হয় পঞ্জিকা মেনে ৷ দুই ধরনের পঞ্জিকা আছে ৷ দৃক-সিদ্ধ পঞ্জিকা ৷ আদৃক-সিদ্ধ পঞ্জিকা ৷ ‘দৃক-সিদ্ধ’ পঞ্জিকা প্রণয়নকারীদের দাবী, জ্যোতির্বিজ্ঞানের সূত্র অনুসারে জ্যোতিষ্কের দূরত্ব টেলিস্কোপের সাহায্যে মেপে তিথি-নক্ষত্র বিচার করেন তাঁরা ৷ ‘আদৃক সিদ্ধ’ পঞ্জিকার গণনা পদ্ধতিতে নাকি টেলিস্কোপিক মানের সাথে পার্থক্য থেকে যায় ৷ প্রতিবছরই এই নিয়ে চর্চা হয় ৷ এই নিয়ে মেঘনাদবাবু এ`বার কোনো আলোচনা শোনেন নি ৷ তবু পূজা ছিল  ভীষণ ম্যার-ম্যারে ৷ বৃষ্টি-রূপী অসুরের আস্ফালন ৷ মেঘের একটি সুন্দর নাম আছে ‘পলাতকা’ ৷ ‘এসেছিলে তবু আস নাই, জানায়ে গেলে,
সমুখের পথ দিয়ে, পলাতকা ছায়া ফেলে...’৷ 

আজকাল পলাতকাকে দেখলে মেঘনাদবাবুর ভয় হয় ৷ গতকাল যাওয়া আসার পথে দুই দুবারের বন্যার ক্ষতি তাঁর নজরে এসেছে ৷ অনেক জমিতেই চাষবাস নেই ৷ গাছ-গাছলা নষ্ট হয়ে গেছে ৷ কৃষকরা আবার চাষা-বাদের চেষ্টা করছে ৷ সংগ্রাম আরেক নাম জীবনের ৷

মেঘনাদবাবু শিউলিকে নিয়ে ইন্টার-নেটে ঘাটাঘাটি করেন ৷ শিউলি ফুলকে আমরা শেফালি ফুল বলেও ডাকি ৷ পারিজাত নামেও আখ্যায়িত হয় ৷ সংস্কৃতে শিউলির অনেকগুলি নাম ৷ নালাকুমকুমাকা, হারসিঙ্গারাপুস্পক, সুকলাঙ্গি, রাজানিহাসা, মালিকা, অপরাজিতা, বিজয়া, নিসাহাসা, প্রহার্ষিনী, প্রভোলানালিকা, বাথারি, ভুথাকেশি, সীতামাঞ্জারি, সুবাহা, নিশিপুস্পিকা, প্রযক্তা, প্রযক্তি ইত্যাদি ৷ বৈজ্ঞানিক নাম : Nyctanthes arbor-tristis ৷ লাতিন Nyctanthes-এর অর্থ ‘সন্ধ্যায় ফোটা’ ৷ আর arbor-tristis-এর মানে হচ্ছে ‘বিষণ্ণ গাছ’ ৷ সন্ধ্যায় ফোটা আর সকালে ঝরা ফুলের মাঝে বিষণ্নভাব দাঁড়িয়ে থাকে ৷ শিউলিকে ‘tree of sorrow’ বা ‘দুঃখের বৃক্ষ’-ও বলা হয় ৷ 

এর পেছনেও একটি গল্প আছে ৷ পারিজাতিকা নামে এক রাজকন্যা সূর্যের প্রেমে পড়েছিলেন ৷ তাঁকে তিনি কামনা করেন ৷ অনেক চেষ্টাতেও তিনি সফলকাম হন না ৷ শেষমেশ তিনি আত্মহত্যা করেন ৷ তাঁর দেহের ভস্ম থেকে পারিজাত গাছ জন্মায় ৷ শিউলি নীরব ব্যর্থ প্রেমের প্রতীক! সূর্যের স্পর্শ মাত্র, শিউলি ফুল অশ্রুবিন্দুর মত ঝরে পরে ৷ তাঁর দুঃখের চিহ্ন শত শত অশ্রুবিন্দুর সুগন্ধি ছড়ায় ৷ আমরা তাই শিউলিকে শুভ্র দেহে গৈরিক বসনে দেখি ৷

মেঘনাদবাবুর ভাবনায় অন্য চিন্তা আসে ৷ একটি ধাঁধা মনে আসে ৷ ধাঁধাটি তাঁর খুব প্রিয় ৷ ত্রিশ ফুট গভীর একটি কুয়ো ৷ যেন সূর্য-মাস ৷ কুয়োর গা ভীষণ পিচ্ছিল ৷ মাসের এক তারিখে একটি শামুক উপরের দিকে উঠতে শুরু করেছে ৷ শামুকটি দিনে তিন-ফুট ওঠে ৷ রাত্রির শিশিরে কুয়োর গা আরো পিচ্ছিল হয়ে যায় ৷ তখন শামুকটি দুই-ফুট নীচে নেমে যায় ৷ শামুকটি মাসের কত তারিখে কুয়োর পারে উঠবে? 

দিনে এক-ফুট করে অগ্রগতি ৷ অনেকেই বলবেন, মাসের ত্রিশ তারিখে ৷ কিন্তু বাস্তবে ওঠার কথা আটাশ তারিখ বিকেল বেলা ৷ সাতাশ তারিখ পর্যন্ত প্রতিদিন একফুট করে সাতাশ ফুট ৷ আর আটাশ তারিখ দিনের বেলা তিন-ফুট ওঠার পর শামুকটির যাত্রা শেষ হবে ৷ আটাশ দিনের দিন বিকেল বেলা ৷ চন্দ্রমাসের শেষ দিন৷

ইদানীং মেঘনাদবাবু ধাঁধার উত্তরটি নিয়ে সন্দিহান ৷ আসলে শিশির ছাড়াও অন্য অনেক ফ্যাক্টর কাজ করে৷ যেমন পলাতকা মেঘ ৷ আমাদের সমাজ জীবনের অগ্রগতিও শামুকের মত ৷ বিজ্ঞানের সৃষ্টিশীল আবিষ্কারের পাশাপাশি ধ্বংসাত্মক আবিষ্কারও ডালা মেলছে ৷ আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনে দুইটি বিপরীত স্বত্বার প্রতিনিয়ত লড়াই চলছে ৷ মঙ্গলের সাথে অমঙ্গলের ৷ ভালোর সাথে মন্দের ৷ সুস্থতার সাথে অসুস্থতার ৷ মানবিকতার সাথে অমানবিকতার ৷ ন্যায়ের সাথে অন্যায়ের ৷ অহিংসার সাথে হিংসার ৷ নির্লোভের সাথে লোভের ৷

মেঘনাদবাবুর ধারনা, শামুকটি কুয়ো থেকে পুরোপুরি উঠতে পারে না ৷ যখন কুয়োর কিনারা বরাবর পৌঁছে ডাঙ্গায় যেতে চায়, তখনই আবার নীচে গড়িয়ে পড়ে ৷ আবার নতুন করে যাত্রা শুরু করে ৷ ব্যাক টু দ্য স্কোয়ার৷ আমরা ত্রিপুরা থেকে উগ্রপন্থা তাড়িয়ে দিলাম ৷ আবার এক ধরনের অশান্তি ৷ খুন-খারাপি ৷ অপহরণ ৷ জাতি-বিদ্বেষ সৃষ্টির প্রয়াস ৷ 

মেঘনাদবাবু ভাবেন, শিউলি ফুল চাঁদের আলোয় ফোটে৷ তার ভালোবাসা ছিল সূর্যের সাথে ৷ সূর্যের তরফে সাড়া ছিল না ৷ চন্দ্র তাই নারী-শক্তির প্রতীক ৷ চন্দ্রের ঋতুচক্র শাশ্বত ৷ তিনি তা নারীদের মধ্যে মূর্ত করেন ৷ চন্দ্রমাসে নারীরা একবার ঋতুমতী হন ৷ কিন্তু সূর্য-মাস কি শাশ্বত? আজকাল সূর্যের ঋতুচক্রের প্রায়ই ওলট-পালট হচ্ছে ৷ তাই শরতে এই বছর মেঘনাদবাবুর শিউলি গাছে ফুলের আকাল ৷ সূর্য অবশ্য এর জন্য দায়ী নন ৷ মূল কারণ প্রাকৃতিক দূষণ ৷ শুভ এবং অশুভ চিন্তার সংঘাত ৷ আবার শম্বুকগতি।

অরিন্দম নাথ
(ত্রিপুরা পুলিশের ডিআইজি ও বিশিষ্ঠ লেখক)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ