এই লভিনু সঙ্গ তব - অরিন্দম নাথ



এবারের জুলাই মাসের ঘটনা ৷ আমার ছেলে নীল ৷ রাজ্যের বাইরে একটি কারিগরী কলেজের ছাত্র ৷ কম্পিউটার সায়েন্স ইজ্ঞিনিয়ারিং নিয়ে পড়ে ৷ গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়িতে এসেছে ৷ এবার তৃতীয় বর্ষে ৷ তার অ্যাসাইনম্যান্ট ছিল রুবিক কিউবের উপর ৷ প্রোগ্রামের মাধ্যমে মেলানো ৷ অ্যাসাইনম্যান্টটি শেষ করার পর সে খোশ মেজাজে ঘুরছিল ৷ এরমধ্যে একদিন অফিস থেকে ফেরার সময় গিন্নীর ফোন ৷ একটি শক্তপোক্ত দেখে রুবিক কিউব নিয়ে আসার জন্য ৷ নীলকে দিয়ে তার প্রোগ্রামটি হাতে-কলমে যাচাই করাবে ৷ অতি উত্তম প্রস্তাব ৷ আমিও সময় নষ্ট না করে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লাম ৷ গুরুজীর সামনে গাড়ি পার্ক করে রুবিক কিউবের সন্ধানে বেরুলাম ৷

ওরিয়েন্ট চৌমুহনীর পর থেকে বইখাতা এবং স্ট্যাশনারি সামগ্রীর প্রচুর দোকান ৷ প্রথম দিকের কয়েকটি দোকানে রুবিক কিউব পেলাম না ৷ এরপর একটি ছোট দোকানের মুখে দেখি খরিদ্দারের প্রচুর ভিড় ৷ উপরে দুইটি প্লাস্টিকের ঢাউস প্যাকেটে শোভা পাচ্ছে ছোট বড় আকারের রুবিক কিউব ৷ সমাপতনই বলতে হবে, কলেজ পড়ুয়া ছাত্রীকে এক দরদী পিতা রুবিক কিউব কিনে দিচ্ছিলেন ৷ ছোটগুলির দাম বিশ টাকা ৷ বড়গুলির দাম পঞ্চাশ টাকা ৷ ভদ্রলোক পঞ্চাশ টাকা দিয়ে একটি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন ৷ আমিও বললাম পঞ্চাশ টাকা দামের একটি রুবিক কিউব দেওয়ার জন্য ৷ তখনও দোকানে দু`তিনজন অন্য ক্রেতা ছিল ৷ দোকানদার আমাকে রুবিক কিউব দিতে দেরি করছিল ৷ আমি কিছুটা অধৈর্য হয়ে বললাম, “কই? কি হল? আমাকে রুবিক কিউব দিচ্ছেন না যে?”

এবার দোকানদার তার চেয়ার ছেড়ে বেরিয়ে এল, “স্যার, আপনার নাম অরিন্দম নাথ না?”
- হ্যাঁ ৷
- আপনি কমলপুর টুয়েলভ স্কুলের টিচার ছিলেন না? এখন পুলিশে চাকুরী করেন ৷
- হ্যাঁ ৷
এবার সে আমাকে পা-ছুঁয়ে প্রণাম করে ৷ নিজে থেকেই পরিচয় দেয়, “আমার নাম রতন ৷ স্যার, আমি আপনার ছাত্র ছিলাম ৷”
রতন দেখতে বেটে-খাটো ৷ মাথায় টাক পড়েছে ৷ আমি ছাত্রাবস্থায় তার চেহারা ঠিক ঠাহর করতে পাড়ছিলাম না ৷ তাই আমি রতনের কাছে জনতে চাইলাম যে সে কোন বছর বোর্ডের পরীক্ষা দিয়েছিল এবং তার সহপাঠী কারা ছিল ৷ রতনের উত্তরে তার ছাত্রাবস্থার চেহারা কল্পনা করা অসুবিধা হল না ৷ রতন বলল, “স্যার এই রুবিক কিউব গুলি চাইনীজ প্রোডাক্ট ৷ টেকসই হবে না ৷ আমার আরেকটি দোকান আছে ৷ সেখানে গ্যারান্টিযুক্ত ভালো রুবিক কিউব আছে ৷”
এই কথা বলে দুই তিনটি দোকান পরে একটি দোকানে নিয়ে গেল ৷ দোকানটি আকারে বড় ৷ রতনের বৌ ক্যাশ-বাক্স সামলাচ্ছিল ৷ একজন কর্মচারী ৷ ভদ্রমহিলা দেখতে কালো ৷ চেহারাতেও সত্যিকার অর্থে তীক্ষ্ণতা নেই ৷ কিন্তু রতন পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর দু`একটি কথা যা বললেন তা থেকে তাঁর প্রতি আমার মুগ্ধতা বেড়ে গেল ৷ তাঁকে শ্রীময়ী মনে হল ৷ তাঁর অন্তরের সৌন্দর্য প্রকাশ পেল ৷ একশ ত্রিশ টাকা দিয়ে রুবিক কিউব কিনলাম ৷ সাথে মনে এক প্রশান্তি এল ৷ ‘এই লভিনু সঙ্গ তব, সুন্দর হে সুন্দর!’ 
এই প্রশংসার পেছনে একটি ইতিহাস আছে ৷ আমি যখন শিক্ষকতা করি কমলপুর সহ সমগ্র ধলাই জেলার একটি বিশাল অংশ ছিল অবিভক্ত উত্তর জেলার অংশ ৷ ছোটবেলা থেকেই আমরা ভারতীয়রা বিভিন্ন কুসংস্কারে ভোগী ৷ আমাদের উত্তর জেলাতেও এমনি কিছু সংস্কার এবং প্রবাদ বাক্য চালু ছিল ৷ ‘আগে গেলে বাঘে খায়, পরে গেলে টাকা পায়’ ৷ এই বাক্যটি হয়তো ‘Fools rush in where angels fear to tread’ এর স্থানীয় রূপ ৷ তাই এর পেছনে হয়তো যুক্তি আছে ৷ কিন্তু কিছু ছিল একদম যুক্তি বিহীন ৷ মাথার চুলে দুটো কুণ্ডলী থাকলে দুই বিয়ে হবে ৷ চিবুকে তিল থাকলে পুরুষ বা মহিলাটি প্রেম দিবানা হবে ৷ পেটে তিল থাকলে পেটুক হবে ৷ হাত চুলকালে টাকা আসবে ৷ পা চুলকালে ভ্রমণ-যোগ ৷ ছোটবেলা থেকেই আমরা কমবেশি হস্তরেখা-বিদ ৷ জীবন রেখা, মস্তিষ্ক রেখা, হৃদয় রেখা সবই চিনি ৷
তখন রতন ক্লাস টেনে পড়ে ৷ আমার কাছে প্রাইভেটে অংক পড়ত ৷ সাথে আরও কয়েকটি ছেলে ৷ তখন জ্যামিতির উপপাদ্য পড়াচ্ছিলাম ৷ অর্ধ-বৃত্তের অন্তর্গত কোণ সমকোণ হয় ৷ সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের বর্গ, সমকোণ-সংলগ্ন দুই বাহুর বর্গের যোগফলের সমান ৷ একদিন ছেলেরা আমার জন্য পড়ার টেবিলে অপেক্ষা করছিল ৷ আমি ঘরে ঢুকতেই দেখলাম রতনকে সবাই উপুড় হয়ে ঘিরে আছে ৷ তার দু`টি হাতের তালু পাশাপাশি অবস্থায় টেবিলের উপর পাতা ৷ এত নিবিষ্ট হয়ে কি দেখছিল জিজ্ঞেস করায় প্রথমে সঙ্কোচ বোধ করল ৷ আমি ছেলেদের সাথে বন্ধুর মত মিশতাম ৷ একটি ছেলে সঙ্কোচ ঝেড়ে ব্যাখ্যা দিল ৷ হৃদয় রেখা আমাদের কড়ে আঙ্গুলের নীচ থেকে শুরু হয়ে তর্জনীর নীচের দিকে এগিয়ে যায় ৷ প্রতিটি ব্যক্তির দুই হাতের হৃদয় রেখা পাশাপাশি মেলালে বৃত্তের একটি জ্যার আকার ধারণ করে ৷ ছেলেরা বাড়িঘরে এক বিচিত্র কথা শুনেছে ৷ এই জ্যা যার ক্ষেত্রে অর্ধ-বৃত্তের যত কাছাকাছি আসবে তার বৌ তত সুন্দরী হবে ৷ সেদিন রতনরা পাঁচজন ছিল ৷ এর মধ্যে রতনের দুই হাতের হৃদয় রেখার সৃষ্ট জ্যা ছিল প্রায় অর্ধবৃত্ত ৷ কিংবা অর্ধ-চন্দ্রাকৃতি ৷ 
রতনের বাকি চার বন্ধুই আজ প্রতিষ্ঠিত ৷ প্রকৌশলী, প্রশাসক, শিক্ষক এবং সমাজ সেবকের ভূমিকায় ৷ সবাই যথেষ্ট নামডাক করেছে ৷ তাদের বৌদেরও আমি দেখেছি ৷ সবাই যথেষ্ট চৌকস ৷ বাহ্যিক সৌন্দর্যে রতনের বৌ থেকে এগিয়ে ৷ তবু, আমার মন বলছে সেদিনের সেই ভবিষ্যৎ বাণীই ঠিক ৷ মনের সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে রতনের বৌ-ই সেরা ৷

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ