সর্ব ধর্মের মানুষের মিলন ক্ষেত্র ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির


উদয়পুর (ত্রিপুরা): ত্রিপুরা তথা ভারতের অন্যতম এক ধর্মীয় পর্যটন ক্ষেত্র ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির। রাজ্যের রাজধানী আগরতলা থেকে প্রায় ৫৬ কিমি দক্ষিন পশ্চিমে গোমতী জেলার জেলা সদর উদয়পুর থেকে ৩কিমি দূরে অবস্থিত এই মন্দির। প্রতিদিনই এখানে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি অসম, পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এমনকি বাংলাদেশ থেকেও পূন্যার্থীরা আসেন। প্রতি বছর দেওয়ালীর সময় তিন দিন ব্যাপি উৎসব ও মেলা বসে। তখন মন্দির চত্বর লোকে লোকারন্য হয়ে পড়ে। 
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মতে এটি সতীর ৫১ পিঠের এক পিঠ। এখানে সতীর দক্ষিন পায়ের কনিষ্ঠ আঙ্গুল পড়ে ছিলো। 

ত্রিপুরা রাজ্যের রাজাদের ইতিহাস লিখিত আছে যে বইয়ে এর নাম রাজমালা। এতে উল্লেখ আছে ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা ধন্যমানিক্য ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। 
এতে এও কথিত আছে যে তিনি বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন, পরে স্বপনাদৃষ্ট হয়ে বর্তমান বাংলা দেশের চট্টগ্রাম থেকে কস্টি পাথরে নির্মিত ত্রিপুরা সুন্দরী দেবীর বিগ্রহ এনে এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন। 
ত্রিপুরা সুন্দরী বিগ্রহ উত্‍কৃষ্ট কষ্টি পাথরে নির্মিত । বিগ্রহের উচ্চতা ১দশমিক ৫৭মিটার । প্রস্থ ৬৪ সে.মি। দেবীমূর্তি একটি পাথরের বেদিতে স্থাপিত। দেবীর চার হাত, মুখমণ্ডল লম্বাটে, তুলনায় চোখ দুটি ছোট। শায়িত মহাদেবের বুকের উপর পা দুটি স্থাপন করে দেবী দাঁড়িয়ে আছেন। দেবীর মাথায় রয়েছে মুকুট ও জটারাশি।
ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দিরটি ত্রিপুরার নিজস্ব স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত বলে অনেক ঐতিহাসিকের অভিমত। মন্দিরের মূল দ্বার পশ্চিমমুখী, উত্তর দিকেও একটি দরজা আছে। মন্দিরের দেয়াল ৮ ফিট পুরু। মন্দিরের উচ্চতা ৭৫ ফিট। চার কোনায় আছে চারটি স্তম্ভ। উপরের গম্বুজ বৌদ্ধ রীতির অনুকরণে নির্মিত বলেও মত অনেকের। এর উপরে সপ্ত কলসী, তার উপরে পিতলের ধ্বজ দন্ড। এই মন্দিরের গঠন শৈলীতে বিভিন্ন প্রদেশ ও ধর্মের মন্দিরের গঠনরীতির সংমিশ্রণ রয়েছে বলেও জানান ঐতিহাসিকরা।  
ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির বিভিন্ন সম্প্রদায় ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর মিলনভূমি হিসাবে স্বীকৃত। মন্দিরের সৃষ্ঠ লগ্নে শৈব সাক্তের  মিল ঘটেছে । মন্দির নির্মিত হয়েছিল বিষ্ণুর জন্য, প্রতিষ্ঠিত হলেন দেবী কালিকা । এখানে মায়ের সঙ্গে নারায়ণ শিলার পূজা হয় এখনো। মন্দিরের প্রধান বৈশিষ্ট হল, এখানে আগত তীর্থ যাত্রী ও পর্যটকদের ধর্ম বা বর্ণ পরিচয় জানতে চাওয়া হয়না। যে কোনও ধর্মের বা বর্ণের মানুষ এখানে পুজো দিতে পারেন। অস্টাদশ শতকের মাঝামাঝি শামসের গাজী উদয়পুর আক্রমণ করেন এবং দখল করে নেন। তখন তিনি নিজে ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দিরে পূজা দিয়েছেলেন বলে কথিত আছে। মন্দির পরিচালন ব্যবস্থার মধ্যেও সকলের অংশ গ্রহণ রয়েছে । উদয়পুরের স্থানীয় মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ ক্ষেতের প্রথম ফসল, গরুর দুধ দেবীকে কে নিবেদন করে থাকেন। জনজাতি গোষ্ঠীর অন্যতম প্রিয় হলেন ত্রিপুরা সুন্দরী দেবী।
মন্দিরে প্রতি দিন পূজা হয়। অন্ন ভোগের ব্যবস্থা আছে । সন্ধায় আরতি হয়। ঐতিহ্য মেনে দশমী তিথি ছাড়াও প্রতিদিন পশুবলি হয়।
ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির বর্তমানে রাজ্য সরকারের অর্থে চালিত হচ্ছে। রাজন্য ত্রিপুরার ভারতভুক্তির চুক্তির শর্তানুসারে গোমতী জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর  'সেবাইত' পদে অধিষ্ঠিত হন। জেলা প্রশাসক ও কালেক্টর, গোমতী জেলা,  সদস্য-সচিব এবং মন্দিরের পুরো ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন।
ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির এবং আশেপাশের এলাকার ভবিষ্যত উন্নয়েনর জন্য,  ত্রিপুরা সরকার মাতা "ত্রিপুরা সুন্দরি মন্দির ট্রাস্ট" গঠন করেছে। এই ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ত্রিপুরার মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী।
সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির পরিদর্শন করে ও মন্দিরের উন্নয়নের জন্য শিলান্যাস করে গিয়েছেন। 
ত্রিপুরা রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব মন্দিরের উন্নয়নের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তার অন্যতম এক ইচ্ছে এই মন্দিরকে দেশের মধ্যে অন্যতম একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি দেওয়া।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ