মারণ নেশা ইয়াবা কামড় বসিয়েছে ত্রিপুরা রাজ্যেও



সম্প্রতি ত্রিপুরা রাজ্যে বি জে পি-আই পি এফ টি জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর সব চেয়ে বেশী জোর দিয়েছে নেশা সামগ্রীর অবৈধ কারবারের বিরোদ্ধে। মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব'র লক্ষ্য নেশা মুক্ত ত্রিপুরা গড়ে তোলা। তাই প্রথম থেকে রাজ্য পুলিশের উপর জোর দেওয়া হয়েছে নেশা দ্রব্য আটক করার উপর। 

মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব'র এই নিদের্শের পর নড়ে চড়ে বসে পুলিশ। তাই প্রতিদিন রাজ্যের কোন না কোন প্রান্ত থেকে ধরা পড়ছে গাঁজা, হেরোইন, ব্রাউনসুগার সহ নানান নেশার ট্যাবলেট। এই ট্যাবলেট গুলির মধ্যে লাল রঙের। নেশাকারবারী ও নেশা সেবকদের কাছে এগুলি নতুন কিছু নয় হয়তো তবে সাধারণ মানুষের কাছে এগুলি নতুন। প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে এগুলি ইয়াবা নামে পরিচিত। বাংলাদেশের একাংশ যুব সমাজকে প্রায় ধ্বংশের মুখে ঠেলে দিচ্ছে এই সর্বনাশা মাদক ইয়াবা। 

কত কয়েক বছর আগে সংবাদ মাধ্যমের দৌলতে রাজ্যবাসী জানতে পেরে ছিলো যে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে ঐশী নামে এক অষ্টাদশী যুবতী তার এক ছেলে বন্ধুর সহযোগিতায় পুলিশ আধিকারিক বাবা ও মাকে খুন করে ছিলো। ঐ মেয়েটি ছিলো ইয়াবাশক্ত পুলিশের তদন্ত তা উঠে আসে। এই উদাহরণ থেকে বুঝা যায় কি ভয়ঙ্কর মারণ নেশা এই ইয়াবা। বাংলাদেশ সরকার এই মারণ নেশা কারবারী, পরিবাহকসহ বিক্রেতাদের বিরোদ্ধে কঠুর শাস্তির ব্যবস্থা করেছে। এর পরও অসাধু ব্যবসায়ীরা ইয়াবার প্যাকেট পায়ুপথে, মহিলারা জননাঙ্গে ঢুকিয়ে পাচার করছে। 


এই মারণ নেশার মূল উৎসস্থল বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মায়ানমার বলে অভিযোগ। মূলত বাংলাদেশের একেবারে দক্ষিনাঞ্চল টেকনাফের নাফ নদী ও সমুদ্র দিয়ে পণ্য বুঝাই ট্রলারে করে প্রথমে বাংলাদেশে ঢুকে ইয়াবার চালান। এই সকল চালান গুলিতে ১থকে ৩লাখ ট্যাবলেট থাকে। এই রুট দিয়ে প্রায় ৭০শতাংশ ইয়াবা মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে খবল। বাংলাদেশে আসারপর এগুলি জুতার তলার সুলের ভেতর, তরমুজ, মিষ্টি কুমড়োসহ অন্যান্য আরো কিছু পদ্ধতি অভলম্বন করে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে অথবা কোন কোন পুলিশ সদস্যদের ম্যানেজ করে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে বলে অভিযোগ। এতো দিন ত্রিপুরাবাসীর এই মারণ নেশার প্রচলন শুধু সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ, কিন্তু নতুন সরকারের কঠুর পদক্ষেপের কারণে সাধারণ মানূষ আজ জানতে পারছেন এরাজ্যের যুব সমাজের একটা অংশও ইয়াবার মারণ কামড়ে ডুবে আছেন। 

একদিকে যেমন ত্রিপুরা থেকে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে যাচ্ছে গাঁজা, ফেন্সিডিলসহ অন্যান্য নিশিদ্ধ কফ সিরাপ ও নেশার ট্যাবলেট তেমনি বাংলাদেশ থেকে ত্রিপুরা রাজ্যেও ঢুকছে ইয়াবা বলে মাদকের খুচরো ব্যবসায়ীদের অভিমত। আবার মায়ানমার থেকে সরাসরি মিজোরাম হয়েও ইয়াবাসহ মাদক ত্রিপুরায় প্রবেশ করছে বলে জানা যায়। এক্ষেত্রে ট্রাঞ্জিট পয়েন্ট হিসেবে কাজ করছে দামছড়া ও কাঞ্চনপুর। তারা আরো জানান রাজধানী আগরতলা থেকে শুরু করে রাজ্যের গ্রামীন ও পাহাড়ী এলাকার একাংশ যুব সমাজ এরধনের মাদকে বুদ। কাঞ্চনপুরের একাংশ মানুষের অভিযোগ এই সকল মাদক পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছে শরনার্থী শিবিরের কিছু যুবক। 


ইয়াবার মূল উৎপাদক দেশ হল মায়ানমার। তবে সে দেশে এর প্রচলন খুব কম। মায়ায়নমারের পাহাড়ী প্রদেশে ঘোড়াদের এই ট্যাবলেন খাওয়ানো হয়। এই ট্যাবলেট খেলে শরীরে তাৎক্ষনিক প্রচুর শক্তি আসে তাই যে কোন কঠিন পরিশ্রম করা যায়। এর এই গুন দেখে যেসকল মানুষ কায়িক পরিশ্রম করে তারা ইয়াবা সেবন শুরু করে। পরবর্তী সময় বাংলাদেশ, থাইল্যান্ডসহ ভারতে এটি ছড়িয়ে পড়ে। ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের যুককযুবতীদের পাশাপাশি সেদেশের দেহব্যবসায়ী নারীরাও এটি সেবন করেন। ইয়াবা ট্যাবলেটটি খেলে তাৎক্ষনিক ও সাময়িক ভাবে উদ্দীপনা বেড়ে যায়। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হেরোইনের চেয়েও ভয়ঙ্কর। নিয়মিত ইয়াবা সেবনে মস্তিষ্কে রক্ত ক্ষরন, নিদ্রাহীনতা, খিঁচুনি, ক্ষুধামন্দা এবং মস্তিষ্ক বিকৃতি দেখা দিয়ে থাকে। এর জেরে ফুসফুস, কিডনী সমস্যা ছাড়াও অনিয়মিত এবং দ্রুতগতির হৃৎস্পন্দনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত মাত্রায় ইয়াবা গ্রহণ হাইপারথার্মিয়া বা উচ্চ শারীরিক তাপমাত্রার কারণ হয়ে যায়। একবার নিয়মিত অভ্যস্ততার পর হঠাৎ ইয়াবার নেশা ছাড়ার চেষ্টা করলে আত্মহত্যা প্রবণতা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা খেলে স্মরণশক্তি কমে যায়, সিদ্ধান্তহীনতা শুরু হয় এবং কারো কারো ক্ষেত্রে সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। অনেকে পাগল প্রায় হয়ে যায়।

এটি মূলত মেথঅ্যাম্ফিটামিন ও ক্যাফেইন মিশ্রিত করে তৈরী করা হয় আবার কখনো কখনো এর সাথে হেরোইন মেশানো হয় নেশাকে আরো তীব্রতর করা জন্য।  এটি ট্যাবলেট হিসেবে খাওয়া হয় হয়, আবার কখনো কখনো ধাতব ফয়েলে পুড়িয়ে ধোঁয়া তৈরি করে তা নাক দিয়ে টেনে নেওয়া হয়। 


 ইয়াবার ইতিহাস ঘাটলে জানা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জার্মানীর প্রেসিডেন্ট এডলফ হিটলার তার মেডিকেল চিফকে নির্দেশ দেন যে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধরত সেনাদের যাতে ক্লান্তি না আসে এবং প্রবল উদ্দীপনায় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। এমনকি বিমানের পাইলটদের নিদ্রাহীনতা, মনকে লড়াকু ও চাঙ্গা রাখার জন্য এমন কিছু ঔষধ আবিস্কার করতে।  রসায়নবিদগণ টানা ৫মাস চেষ্টা চালিয়ে মিথাইল অ্যামফিটামিন ও ক্যাফেইনের সংমিশ্রনে তৈরি করলেন ইয়াবা। এতেই হিটলারের উদ্দেশ্য সফল। সেনারা মানসিক শক্তিতে উদ্যজীবিত হল।  

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক সেনাবাহিনীর জওয়ানরা ভারতীয় সেনা বাহিনীর বিরোদ্ধে লড়াই করার সময় ইয়াবা সেবন করতো। 

ইয়াবা ট্যাবলেটের রং সাধারণত সবুজ বা লালচে কমলা হয়ে থাকে। এর নানা রকম ফ্লেভার আছে। আঙ্গুর, কমলা বা ভ্যানিলার স্বাদে হয়ে থাকে। এই কারণে প্রথমে একে অনেকে ক্যান্ডি বলে ভুল করে থাকেন। 

আগরতলাসহ রাজ্যের অন্যান্য জেলাতেও পুলিশের নেশা বিরোধী অভিযানে বেশ কিছু জায়গায় অন্যান্য মাদক দ্রব্যের সঙ্গে উদ্ধার হয়েছে ইয়াবা। এখন দেখার বিষয় ভয়ঙ্কর এই নেশা থেকে এই রাজ্যকে মুক্ত করা যায় কিনা ? 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ