কচুরিপানা অভিশাপ নয় সৃষ্টির আশির্বাদ


NWB, এস চন্দ্রনাথ: ত্রিপুরা রাজ্যের খাল, বিল, নালা, পুকুর, ডুবা, মৃত নদী এমনকি নিচু ধানের জমিতেও কচুরিপানা দেখা যায়। বর্ষার শুরুতে বৃষ্টির জলে যখন জলায়সহ নিচু জমি টৈটুম্বুর হয়ে থাকে, তখন জন্ম নেয় কচুরিপানা। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে এই কচুরিপানা মানুষের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এগুলির বৃদ্ধি এতো দ্রুত হয় যে কয়েক দিনের মধ্যে গোটা জলাশয় ও জলজমা জমি ভরে যায়। ফলে একদিকে যেমন জমিতে ধান চাষে প্রচন্ড বাধার সৃষ্টি হয় তেমনি জলাশয়ে কচুরিপানা হলে মাছ চাষের সমস্যা হয়। আবার বড় বড় ও গভীর লেকে কচুরিপানা হলে মাছের খুব বেশী সমস্যা না হলেও জেলেদের সমস্যা হয়, তারা নৌকা নিয়ে যেমন চলাফেরা করতে পারেন না তেমনি মাছ ধরার জন্য জাল ফেলতেও সমস্যা হয়। এতো গেলো সাধারণ ভাবে দেখা সমস্যা। 

কচুরিপানার কারণে আরো অনেক সমস্যা হয় যেমন কচুরিপানা যখন জলাশয়ে পচে নষ্ট হয় তখন বিষাক্ত গ্যাসের সৃষ্টি করে ও জলে অক্সিজেলের মাত্রা খুব কমে যায়। ফলে এক দিকে যেমন বিষাক্ত গ্যাসের কারণে তেমনি অক্সিজেনের অভাবে মাছের মৃত্যুও হয় বলে জানান পরিবেশবিদরা। এমনকি এই জল মানুষের পানেরও অযোগ্য হয়ে উঠে। এই সকল কারণে আমাদের রাজ্যে কচুরিপানা বেশীর ভাগ মানুষের কাছে এক বড় সমস্যা। তবে চা বাগানে সামান্য পরিমান কচুরিপানা ব্যবহার করা হয়। মূলত শুক্ন মরসুমে মাটি যখন শুকিয়ে যায় তখন চা গাছের গুড়ার মাটিতে কচুরিপানা বিছিয়ে জল সেচ দেওয়া হয়। ফলে বেশ কিছুদিন বেশী মাটির আদ্রতা বজায় থাকে।

এবার একটু পেছন ফিরে কচুরিপানার ইতিহাস জেনে নেওয়া যাক। কচুরিপানার ইতিহাস ঘাটলে যতদূর জানা যায় ১৮০০ খ্রীষ্টাব্দের শেষের দিকে জার্মানী থেকে এর হালকা বেগুনী, হলুদ ও সাদা রঙ্গের ফুলের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে পর্যটক ভারতীয় উপমহাদেশে কচুরিপানা নিয়ে আসে এবং ১৯২০সাল আসতে আসতেই সমগ্রী ভারতসহ গোটা দক্ষিন এশিয়ার জলাশয় গুলি কচুরিপানায় ছেয়ে যায়। তাই এখনো অনেক এলাকায় কচুরিপানাকে জার্মানীপানা নামেও বলে থাকেন। পরবর্তী সময় এই কচুরিপানা মানুষের সমস্যার কারণ হয়ে উঠে। 

তবে ত্রিপুরা রাজ্যের বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে কচুরিপানাকে এখনো অভিশাপ হিসেবে গন্য করা হলেও বিভিন্ন দেশে একে প্রকৃতির এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে মনে করছেন ও তা থেকে অর্থ উপার্জন করছেন। এর জন্য খুব বেশী দূরে যেতে হবে না ত্রিপুরার প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে কচুরিপানা থেকে তৈরি হচ্ছে জৈবসার, মুরগের মত দেখতে এক প্রাণী টার্কি এর খাবার, ডাটা দিয়ে তৈরি হচ্ছে কাগজ। 

আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশেও এখন কচুরিপানা থেকে জৈব সার তৈরি করা হচ্ছে এবং এই জৈব সার থেকে তৈরি করা হচ্ছে অর্গানিক ফসল। 

আফ্রিকার মহাদেশের মিষ্টি জলের সর্ববৃহৎ হ্রদ লেক ভিক্টোরিয়া। এর আয়তন ৬৯৪৮৪বর্গকিমি। এটি তাঞ্জানিয়া, উগান্ডায় অবস্থিত আবার লেকের এক পাশে রয়েছে কেনিয়া সীমান্ত। এই সকল দেশের প্রায় ৩কোটি মানুষ হ্রদে উপর নির্ভরশীল কিন্তু এতে জন্মানো কচুরিপানাকে এক সময় অভিশাপ হিসেবে গন্য করছিলেন এর ব্যাপক গ্রাসের কারনে জেলেদের জীবিকায় ব্যাপক প্রভাব পড়ছিলো, কিন্তু এখন একে আশির্বাদ হিসেবে দেখছেন তারা। কেননা এর কচুরিপানা দিয়ে জৈব সার তৈরি করে অতি অল্প খরচে সব্জি উৎপাদন করে অধিক লাভ করছেন এই সকল এলাকার চাষিরা। এর ফলে হ্রদের কচুরিপানা পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে। জেলেরা নৌকা নিয়ে সহজে মাছ ধরতে যেতে পারছেন। 

কৃষি গবেষকরা বলছেন কচুরিপানা গর্তকরে রেখে এর মধ্যে ছাই দিয়ে মাটি চাপা দিয়ে রাখলে দুমাসের মধ্যে তা জৈব সারে পরিনত হচ্ছে। কচুরিপানা দিয়ে তৈরি জৈব সারে নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম এবং ফসফরাস এই তিনটি উপাদান যথেষ্ট পরিমানে থাকে, যেগুলি চাষের জন্য খুব প্রয়োজনিয় উপাদান। এই সকল কারণে কৃষি গবেষকরা জৈব সার দিয়ে চাষের জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করছেন। জৈব সারের আরো একটি ভালো বৈশিষ্ট হলো এগুলি মাটিতে থাকা অনুজীবিদের কোন ক্ষতি করে না। যারা মাটিতে বায়ু চলা চলের ব্যবস্থা করে উর্বরতা বাড়ায়। অথচ রাসায়নিক সার ব্যবহার করলে বেশীর ভাগ সময় মাটিতে বসবাসরত উপকারী কিটপতঙ্গসহ অনুজীবিদের মেরে ফেলে। এমনকি জৈবসার মাটিতে আদ্রতা ধরে রাখতেও সহায়তা করে। তাই রাসায়নিক সার'র তুলনায় অনেক কমটা কম সেচ দিয়ে চাষ করা যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ